নীল বিদ্রোহ ঘটেছিল কেন? এই বিদ্রোহের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করাে। অথবা, নীল বিদ্রোহ কীভাবে নীলকরদের বিরুদ্ধে আঘাত হেনেছিল? 

নীল বিদ্রোহ ঘটেছিল কেন? এই বিদ্রোহের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করাে। অথবা, নীল বিদ্রোহ কীভাবে নীলকরদের বিরুদ্ধে আঘাত হেনেছিল? 8 Marks/Class 10

উত্তর:

ভূমিকা :- 

: প্রথম অংশ : 

নীল বিদ্রোহের কারণ : ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে যেসব গণআন্দোলন জাতীয় জাগরণে সর্বাধিক সাহায্য করেছিল তাদের মধ্যে নীল বিদ্রোহ (১৮৫৯-৬০ খ্রি.) অন্যতম।

বিদ্রোহের কারণ : ইংরেজ নীলকরদের অমানুষিক অত্যাচারেন বিরুদ্ধে সংঘটিত নীল বিদ্রোহের কারণগুলি হল —

১) অলাভজনক নীলচাষ : ইউরােপীয় নীলকররা ধান বা পাট চাষের বদলে চাষিকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে অলাভজনক নীলচাশে বাধ্য করলে নীলচাষি-নীলকর বিরােধ তীব্র হয়। 

২) দাদন প্রথা : নীলকররা নীলচাষিকে চাষের জন্য বিঘা দু’টাকা ‘দাদন’ বা অগ্রিম নিতে বাধ্য করে ও বলপূর্বক নীলচাষে বাধ্য করে। একবার দাদন গ্রহণ করলে নীলচাষিদের দুর্দশার শেষ থাকত না।

৩) উপযুক্ত মূল্যের অভাব : উৎপন্ন নীলের উপযুক্ত মূল্য না পাওয়ায় তারা বংশানুক্রমে আর্থিক দায়গ্রস্ত থাকত, এমনকি অনেক সময়ে নীলকরদের বেগার শ্রমদান করতেও বাধ্য হত। 

৪) নীলকরদের অত্যাচার : নীলকুঠির লাঠিয়ালরা অবাধ্য চাষিদের ওপর হামলা, তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া, চাষির স্ত্রী-কনাদের অপহরণ ও লাঞ্ছনা, কৃষকদের গবাদি পশু আটকে রাখা ইত্যাদি নানা নির্যাতন চালাত। এই রকম অত্যাচার প্রায় দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর ধরে চলেছিল।

: দ্বিতীয় অংশ :

বিদ্রোহের বৈশিষ্ট্য : ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দের শেষ দিকে কৃষ্ণনগরের কাছে চৌগাছা গ্রামে কৃষক বিদ্রোহ শুরু হয়। ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাস থেকে বিদ্রোহের আগুন নদিয়া, যশােহর, বারাসত, পাবনা, রাজশাহী, মালদহ, ফরিদপুর পর্যন্ত বিস্তৃত অঞলে ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় ৬০ লক্ষ কৃষক এই বিদ্রোহে যােগ দেয়। এই বিদ্রোহে যে বৈশিষ্ট্যগুলি লক্ষ করা যায়, সেগুলি হল— 

১) কৃষকদের সংঘবদ্ধ প্রতিরােধ : অন্যান্য কৃষক আন্দোলনের তুলনায় নীলবিদ্রোহের তীব্রতা ছিল ব্যাপকতর। এই স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ প্রসঙ্গে ক্যালকাটা রিভিউ’ পত্রিকা মন্তব্য করেছিল এটা একটা বিদ্রোহ—সমস্ত দেশই এতে যােগ দিয়েছে। 

২) জমিদারদের অংশগ্রহণ : অন্যান্য কৃষক বিদ্রোহের মতাে নীলবিদ্রোহ জমিদার বা মহাজন-বিরােধী আন্দোলন ছিল না, বরং রানাঘাটের শ্রীগােপাল পাল, সাধুহাটির মথুরানাথ আচার্য প্রমুখ বেশ কিছু জমিদার এই বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেন। 

৩) শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের সমর্থন : শিশিরকুমার ঘােষ, গিরিশ ঘােষ, মনমােহন ঘােষ, কিশােরীচাঁদ মিত্র প্রমুখ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ব্যক্তিরা নীলবিদ্রোহকে সমর্থন করেন। হরিশচন্দ্র মুখােপাধ্যায়, দীনবন্ধু মিত্র, মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্রমুখ একদিকে যেমন নীল চাষিদের মামলা-মােকদ্দমার খরচ বহন করতেন, অন্যদিকে তাদের পত্রপত্রিকার মাধ্যমে নীলকরদের অত্যাচারের কাহিনি জনসাধারণের কাছে তুলে ধরেন। 

৪) হিন্দু-মুসলিম ঐক্য : নীলবিদ্রোহ কোনােভাবেই সাম্প্রদায়িক আন্দোলন ছিল না। নিপীড়িত হিন্দু-মুসলমান কৃষক একযােগে নীলকরদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। 

৫) সংবাদপত্রের ইতিবাচক ভূমিকা : ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’, ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’, ‘সােমপ্রকাশ’ প্রভৃতি পত্রপত্রিকা নীলকরদের অত্যাচারের কাহিনি প্রকাশ করে নীল বিদ্রোহের ইতিবাচক জনমত গঠনে সহযােগিতা করে। 
৬) অন্যান্য বৈশিষ্ট্য : নীল বিদ্রোহের অন্যান্য বৈশিষ্ট্য হল— (১) এটি শুরুতেই হিংসাত্মক বিদ্রোহ ছিল না; (২) নীল বিদ্রোহ শুরুর পরেও বাংলার গভর্নর পিটার গ্রান্টের সরকারি সমর্থন লাভ করেছিল; (৩) এই বিদ্রোহ জমিদার ও মহাজনবিরােধী ছিল না। বরং তা ছিল নীলকর বিরােধী বিদ্রোহ।


Note: এই আর্টিকেলের ব্যাপারে তোমার মতামত জানাতে নীচে দেওয়া কমেন্ট বক্সে গিয়ে কমেন্ট করতে পারো। ধন্যবাদ।

Class 10, Class 10 History

Leave a Comment

Your email address will not be published.